Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu
Showing posts with label Sreemoyee Bhattacharya. Show all posts
Showing posts with label Sreemoyee Bhattacharya. Show all posts

Monday, May 30, 2016

আমি এবং রবীন্দ্রনাথঃ ১ - শ্রীময়ী ভট্টাচার্য্য



আমি এবং রবীন্দ্রনাথ - ১


আমি যখন জন্মেছিলাম, আমার রং ছিল ভয়ানক কালো। বাবা নাকি সিস্টারদের বলেওছিল, এ আমার মেয়ে নয়। পাল্টাপাল্টি হয়েছে। কিন্তু কেউ শোনেনি। বাবার নিজের রং নিয়ে গর্ব ছিল বোধহয়। সাদা চামড়ার লোকরা শুনলে কী হাসবে ভাবুন!
আমার দিদির ডাকনাম ছিল দোয়েল। তার সাথে মিলিয়ে আদর করে দিদি আমার নাম রাখে কোয়েল। বরাবরের অপছন্দের নাম আমার। কিন্তু আমি বোঝার বয়সে পৌঁছে বুঝলাম আমার গোটা পৃথিবী আমায় ওই নামেই ডাকে, অগত্যা..
তো এহেন দোয়েল-কোয়েলপাখি খেলতে যেত শ্যামলীমাসির বাড়ি।
শ্যামলীমাসি আর সত্যবানমামা। এঁরা এক দম্পতি। মাসি এবং মামা, কারণ দুজনের সাথেই আমাদের পরিচয় মায়ের সূত্রে। এঁরা দুজন আলাদা মানুষ। বিবাহিত হওয়াটা এঁদের একমাত্র পরিচয় নয়। ওঁদের বাড়িতে একটা বড় খেলার মাঠ ছিল। আর,ওঁরা দুজনেই ছিলেন টেগোর ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী।
আমি তখন ছোট। সবে নার্সারি টু। আমার ওই বাড়িতে যাতায়াত মূলত খেলাধুলোর জন্য। ছোটবেলায় আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল, আমার বাবা বা মা সকাল থেকে উঠে দৈনন্দিন কাজ নিয়ে কথা বলে, বা বলে না। বাবা অফিস যায় আর সন্ধেবেলা আড্ডা মারতে বেরোয়। মা রান্নাবান্না করে আর সন্ধেবেলা দিদির বন্ধুদের পড়ায়। অথচ, কেউ একবারের জন্যেও খেলতে যেতে চায় না! কী ভীষণ বোরিং! আমি তখন ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করি। আমি রোজ তাকে বলি, ঠাকুর, আমি যেন কখনো বাবামায়ের মত না হয়ে যাই। যেন রোজ খেলতে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেটা আমার মন থেকে মুছে না যায়।
হা ঈশ্বর!
শ্যামলীমাসির কাছে দিদি কবিতা, নাটকও শিখত। দিদি ক্লাস থ্রি। দিদিরা সেবার ‘ছাত্রের পরীক্ষা’ শ্রুতিনাটকের আকারে করছে। রোজ রিহারস্যাল। আমারও খুবই সুখের দিন। মা দিদির সাথেই বসে থাকে, রিহারস্যাল শোনে, আর আমি সন্ধে পেরিয়ে রাত অবধি খেলি।  অনুষ্ঠানের দিন একদম কাছে। পুরোদমে মুখস্ত চলছে পার্ট। হঠাত, ঠিক দুদিন আগে দিদির ধূম জ্বর। কী হবে এবার? সবার নজর পড়ল আমার উপর। আমার বয়স তখন চার। পড়তেও শিখিনি একবর্ণ। শ্যামলীমাসি তাও একবার বলল, একটা লাইন বলার চেষ্টা করতে। আর ওমা, আমি গড়গড় করে বলে ফেললাম নাটকটা! কখন যে শুনতে শুনতে আমার মুখস্ত হয়ে গেছে সব ডায়ালগ, আমি নিজেই জানিনা! অনুষ্ঠানের পর মায়ের কাছে শুনেছি, সব দর্শকের কোলে অন্তত একবার করে ঘুরেছিলাম আমি।
সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার আলাপ, আর ওঁর হাত ধরে আমার হিরো হওয়া।
তারপর একবছর পেরিয়ে গেছে। নিলভনার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। ক্লাসের যেকোনো কাঁদুনে বাচ্চার স্কুলতুত মা আমি। আর ওদিকে দিদি ক্লাস ফোর। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, যেই স্কুলেই আমার গোটা ছোটবেলা কেটেছে, তার সব ভালো, শুধু, আমাদের সময়ে একটাআডমিশন টেস্ট হত ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে ওঠার, যা ছিল যমের চেয়েও ভয়ঙ্কর! আমরা ছিলাম ঘোর কট্টরপন্থী বাঙালি পরিবার। ফলে বাংলা মিডিয়াম ছাড়া কোথাও পড়ানোর কথা আমার বাবামা কখনো ভাবতই না। আর কাছাকাছি তেমন ভালো মেয়েদের বাংলা মিডিয়াম স্কুল নেই বলে ওদের ধারণা ছিল। ফলে এখানেই ফাইভে চান্স পেতেই হবে।
আর তখন আবার ছেলেদের মায়েরা ভীষণ গর্বিত হয়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠাতে চাইছেন ছেলেদের। বুকে পাথর রেখে ছেলেকে হস্টেলে রাখবেন, তবু পড়াশুনো এবং মানুষ হওয়া শিখবে ছেলেরা। আমার মায়ের দুঃখেচোখ ফেটে জল। কেন যে রামকৃষ্ণ মিশনে মেয়েরা পড়তে পারে না! আমার মেয়ে দুটো মানুষ হবে তো?
যাই হোক, তো আমার চতুর্দিকে সবাই তখন উন্মাদের মত পড়াশুনো করে চলেছে। আর বাবামায়েরা ফর্ম তুলতে ছুটছে, নয়তো ফর্ম ভরছে।
এমনই এক সকালে, আমি কলম ধরলাম।
‘নরেন্দ্রপুর খুব শান্ত।
সবাই হয়েছে ক্লান্ত।
এ’প্রান্ত, ও’প্রান্ত...
সকলেই উদ্ভ্রান্ত।’
না। উদ্ভ্রান্ত শব্দটা আমি জানতাম না অবশ্যই। কারুর মুখে শুনেছিলাম, বানানটাও ধার করে লেখা।
বয়স তখন ৫। নার্সারি থ্রি। মা যখন আনন্দে ডগমগ, রোয়াব নিয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমাদের রবীন্দ্রনাথ যেন প্রথম কবিতা কবে লেখে?’ মা খুব গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলেছিল, ‘৮ বছর বয়সে।’ মা কোনমতেঠোঁট কামড়েহাসি আটকাচ্ছিল তখন, কিন্তু আমার চোখে ছিল যক্ষের ধন জয় করারঅহংকার -‘আমি একটু আগেই লিখলাম।’
তারপর নাকি একটু ভেবে বলেছিলাম, ‘হুহ! তাহলে কে বড়? আমি, না রবীন্দ্রনাথ?’

শ্রীময়ী ভট্টাচার্য্য
Sreemoyee Bhattacharya