Showing posts with label Story. Show all posts
Showing posts with label Story. Show all posts

Tuesday, June 13, 2017

বিদিশা কোত্থাও নেই : সুপ্রিয় সাহা

বিদিশা কোত্থাও নেই
প্রত্যেকটা ধারনাকে ভেঙে দিতে প্রমান লাগে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ। কিছুদিন যাবত পর্ণ সাইট গুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার জন্মগত ধারনা ভেঙে যাচ্ছে যে, ওরাল সেক্স শুধুমাত্র বহিরবিশ্বেই বহুল প্রচলিত, সেখানকার ছেলেমায়েরাই তাতে স্বাভাবিক!! বেশ কিছু এমএমএস বা লিকড ভিডিও ডাউনলোড করে দিনের পর দিন লক্ষ্য করলাম কত অবলীলায় আমাদের দেশীয় মেয়েরা আঁখের খেতের ঘেরাটোপে, পার্কের নির্জনে কিমবা স্কুল বাথরুমে কখনও স্কুল শাড়ী খুলে কিমবা বোরখার ঘোমটা হটিয়ে মুখে চালান করছে পুরুষঠ পুরুষাঙ্গ। এইসব ঘটনা আমার পূর্ব ধারনাকে ভেঙে দিতে সাহায্য করেছে শুধু, কিন্তু ওরাল সেক্স নিয়ে আমায় কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারেনি। বরং এগুলো আমায় বিচলিত করেছে, বার বার করে মনে পড়িয়ে দিয়েছে বিদিশাকে।
বিদিশাকে নিজের মতো করে পাওয়ার কোন বন্দবস্ত আমি করে রাখতে পারিনি কিমবা সেও করে দিতে চায়নি। তার কোন ফোন নাম্বার নেই আমার কাছে। নেই কোন স্থায়ী ঠিকানা। সে কোন ঈশ্বরও নয় যে আমি তাকে ডাকলেই ঘোমটা হটিয়ে নজরানা দেবে আমায়, বরং এটা স্বীকার করতে কোন অসুবিধে নেই যে তার কোন ছবিও নেই আমার হাতে। কেন নেই কেন নেই এসব ভেবে আপনারা যারা মাতাল হচ্ছেন তাদের এই লেখা পড়ার বয়স হয়নি এখনও-এছাড়া আমার কীই বা বলার থাকতে পারে!
কোন এক শনিবারের বিকেল শেষে শহুরে ধুলো থিতিয়ে চাকার দাগ মিটে যাচ্ছে এমন অন্ধকার। আমি আছি কিমবা নেই হয়তো পৌঁছে যাব এইমাত্র কিমবা যাবনা জানি না। শীত পড়ছে। যেসব শীতে কোলকাতার মানুষ গায়ে রঙ্গিন স্বপ্ন জড়ায় এমন শীতে সেখানে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। বাড়ি ফেরার পালা, লাঠির মাথায় উঁচু করে আটকে থাকা সদ্য টিয়ার বাচ্চা, পায়ের আঠা ডানায় জড়াজড়ি, অপেক্ষা আর অপেক্ষার শুরু কবে তার মনিব ভুলে যাবে খাঁচার ছিটকিনি। দূরে ভেঙে যাওয়া অজয়ের পাড়। একটু পরেই একতারা কাঁদবে। লক্ষ্মীসায়রে এখন একাকীত্ব ঘনাবে। ক্রমশ একা হতে হতে তার জল এখন শুধুই স্থির।

Sunday, June 11, 2017

ভালু : ডাকনামে সমুদ্র

 ভালু

আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম একটা সর্ষেক্ষেতে। আসলে আগের বছর এখানে সর্ষেচাষ হয়েছিলো। তারপর একবছর আর কিছুই হয়নি। তাও নামটা থেকেই গেছে। আম্মু আর দিভাইকে পাচ্ছিলাম না। ওদের নাকি জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেছে। রশিদ এর প্যান্টের দড়িটে খুলে যাচ্ছে। ওর আম্মুকেও নিয়ে গেছে। রশিদ কাঁদছিলো বোকার মত। আব্বু তো বল্লো, একটু বাদেই আম্মু আর দিভাই চলে আসবে। রশিদের আম্মুও। আজ সাত নম্বর রোজা। আব্বুর রোজা ভেঙে গেছে। একবার খারাপ কথা বলেছে আব্বু। বাড়িতে খারাপ কথা বলে না আব্বু। রশিদের এর বাবার মত মাকে মারেও না। রশিদ একবার রাতে ওর আব্বু আম্মু কে কিসব করতে দেখেছিলো। আমার আব্বু আম্মু কেন ওসব করে না? আমি কেন দেখতে পাই না? আম্মুরা এখনো ফিরছে না জঙ্গল থেকে। ওদিক থেকে পচা পচা গন্ধ আসছে। কুকুর পচলে যেমন গন্ধ আসে। আম্মুরা জঙ্গলে কি করছে? ইসস। ওদের সাথে গেলে ভালো হতো। রশিদ আর আমি একবার লুকিয়ে জঙ্গলে গেছিলাম। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ওই জঙ্গলে এখন কিরকম সব লোক থাকে। আব্বু বলে, ওরা জওয়ান। ওদের বন্দুক থাকে। রশিদ একবার ওদের কাছে বন্দুক চেয়েছিলো। একটা লোক বলেছিলো, আগে তোর আম্মি কে নিয়ে আয়। রশিদের আম্মি সেদিন রশিদকে খুব মেরেছিলো। কি হতো একবার গিয়ে বললে? বেশ মজা হতো।

আম্মুরা ফিরে এসেছে। সবাই খুব কাঁদছে। ইসস আম্মির গলায় কেমন কালশিটে। আম্মু কাঁদছে। রশিদের মা পেট চেপে মাটিতে শুয়ে। সবাই এসেছে, দিভাই খালি আসে নি। আব্বু ওই লোকগুলোর কাছে গিয়ে কিসব বলছে। ওরা হাসছে। দিভাই কি জঙ্গলে হারিয়ে গেছে? ভালু আছে নাকি ওই জঙ্গলে। দিভাই কে কি ভালু...

দিভাই এর সাথে সাহিন ভাইয়ের শাদি হওয়ার কথা ছিল। দিভাই ছাড়া গ্রামের সবাই ফিরে এসেছে। জঙ্গলের দিক থেকে খুব পচা পচা গন্ধ আসছে। অনেকগুলো কুকুর একসাথে মরে গেলে যেমন গন্ধ আসে আর কি... দিভাই এর একটা ভালু আছে। সাহিন ভাই দিয়েছিলো। লাল রঙের। সেটা জড়িয়ে আজ ঘুমালে নিশ্চয় দিভাই মারবে না।
















ডাকনামে সমুদ্র
Ocean in the name

Thursday, June 8, 2017

পানশালার মনোলগ : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

পানশালার মনোলগ

দুপুরের পানশালা। চড়া রোদ বাইরে। মদের থেকেও বেশি রোদের জন্য ভেতরে ঢুকলো হিমাংশু। উইকএন্ডের দুপুর।পানশালায় ভাঁটা। ফাউন্টেন থেকে একটা বিয়ার নিয়ে কোণের ফাঁকা সিঙ্গল টেবিলে গিয়ে বসলো। নীথর শহরতলীর দুপুরে ভেতর-বাইরে এক হয়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়াল-টিভিতে ক্রিকেট—অ্যাশেজ সিরিজ, আর অন্যদিকে হর্স রেস ঘিরে কয়েকজন বৃদ্ধের জটলা। অদূরের টেবিলে দুটি মেয়ে কথা বলতে বলতে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। হিমাংশুর দিকে পিঠ করে যে মেয়েটি বসে আছে তার মুখ দেখতে না পেলেও বাঁ পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে আসা কালো চকচকে লং-বুট হাতের সাথে তাল ঠুকে ওঠানামা করছে, কখনো হাঁটুর ঠিক নিচে, কখনো আবার গোড়ালির কাছাকাছি ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। হিমাংশু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিম্বা দেখতে। মেয়েটির সব কথা তার লং-বুটের সরব ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বুজে আসছে ভাঁজ-শব্দে। হিমাংশু বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে টেবিলে রাখা সিডনী মর্নিং হেরাল্ডে চোখ দিলো। সংবাদ-শব্দ সরব হয়ে উঠতে লাগলো। মগজে তার দৃশ্যের মৌচাক।
গোটা কাগজ জুড়ে ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে রিপোর্ট। সিরিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নানা দেশ থেকে কাতারে কাতারে লোক জার্মানীতে ঢুকছে। তাদের হাসি-কান্নায় ভাঙা মুখ, কোলে বাচ্চা, খুলে রাখা জুমড চটি জোড়ার ছবি। টার্কির ৩ বছরের আয়্লানের বালিতে গুঁজে থাকা নীথর মুখ। এই ছবিটা শেষ দু-তিনদিন ধরে অনবরত সোশাল মিডিয়ায় ট্রল করছে, দেখেছে হিমাংশু। না, সে শেয়ার করেনি, কোথাও বেঁধেছে, কোথায়, কি, তা ঠিক করে বলা মুশকিল। ফেসবুক টুইটারের এই অবাধ মৃত্যু-মৃত্যু খেলায় এবং জ্ঞান আর নৈতিকতার লড়াইয়ে সচরাচর ঢুকতে ইচ্ছে করে না ওর। পছন্দগুলো ‘লাইক’ হয়ে গেছে, সারাদিন আকাশ থেকে খসে খসে পড়ছে। টার্কির ৩ বছরের শিশু মৃত্যুর বোট থেকে ফটোগ্রাফের আগ্রাসী দৃষ্টির বোটে উঠে সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে অনুকম্পা আর বাণীবাণ হয়ে উঠেছে। আয়্লান কি ভাবছে এই সব ট্রলিং নিয়ে? সমুদ্রে কি ট্রলার চলছে এখনো? তার বাবা কি এখনো মরে যাবার কথা বলছেন ইন্টারভিউয়ে? হিমাংশু পাতা উল্টে এগিয়ে চলে। শেষ ক'দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তোলপাড় রিফিউজি ইনটেক নিয়ে। 
বর্তমান সরকার লিবারালদের। বছরখানেক ধরেই টনি অ্যাবটের তথাকথিত 'বোট পলিসি' নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।

Saturday, June 3, 2017

মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার : অদ্বয় চৌধুরী

মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার

—     চোখ মেলতেই ঝলসানো আলো। চোখ ধাঁধানো। সামনে একটা ভেজানো দরজা। সামান্য এক চিলতে ফাঁক আছে। সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে ওই ঝলসানো আলো। উজ্জ্বল হলুদ। মাঝেমাঝে গেরুয়া ছোপ। দরজার ওপারে একটা বড় ঘর। তার চারিদিকে গনগনে আগুন। তবে তা স্পর্শ করে না আমায়। কিন্তু গরম আঁচ ছুঁয়ে যায়। ঘাম ঝরে। জ্বালা করে— শরীর, চোখ। চোখ দিয়ে জল ঝরে। উপরে, ঘরের ছাদ থেকে, ঝুলছে অসংখ্য মৃতদেহ। মানুষের। মাথা নীচের দিকে, পা উপরে। গোটা শরীরটাই দলা পাকিয়ে ছোট হয়ে গেছে আগুনে পুড়ে। বডিগুলো সবকটাই আগুনে ঝলসানো। বিভৎস চেহারা। কালচে লাল রং। সাদা রঙের এক ডাইনিং টেবিল, নীচে, ঘরের ঠিক মাঝখানে। ঘরের সেই আগুনে-আলো উধাও হয়ে যায়, হঠাৎ। বদলে, সাদা ঝকঝকে আলো ভরিয়ে দেয় ঘর। ভাসিয়ে দেয়। ঘরের উত্তাপও উধাও। বরফ-ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। আমি বসে আছি সেই টেবিলটার এক মাথায়। আমার সামনে একপ্লেট ঝলসানো মাংস। তন্দুরি। আমি ওই কালচে লাল মাংসপিণ্ড খেতে লাগি, ধিরে ধিরে। সেই লম্বা টেবিলের উলটো প্রান্তে একটি অবয়ব ফুটে ওঠে হঠাৎ। আবছা। তারপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক যুবক। স্যুট-টাই পড়া। চোখে চশমা। নিখুঁতভাবে দাড়ি কামানো। স্মার্ট চেহারা। ছেলেটি মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে। মনে হয় আমার এই তন্দুরি খাওয়া, তার স্বাদ উপভোগ করা— সবই ও দেখেছে। ঠিক বোঝা যায় না। তখনই সে কথা বলে ওঠে।
—     সো, মিস্টার সিংহানিয়া, এই পার্টিকুলার নাইটমেয়ারটি রেকার করে আপনার ঘুমের মধ্যে? বারবার? প্রতি উইকে তিনবার থেকে ছ’ বার?

সিংহানিয়া বয়স্ক মানুষ। ষাট পেরিয়েছে। ভারী চেহারা। হাত-পা ছেড়ে, চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে। বরফখণ্ডের মতো ফ্যাকাসে, শুষ্ক, কঠিন মুখচোখ। খানিক ক্লান্তির ছাপ আছে তাতে। টেবিলে রাখা ড্রিঙ্কস-এর গ্লাসের গায়ে ঘরের চিলড্ টেম্পারেচারের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। সাদা ভাপ ধরেছে। সামনে বসে থাকা ধোপদুরস্ত ছেলেটা তার থেকে অনেক ছোটো। সিংহানিয়া ভালো করে মাপতে থাকে ছেলেটাকে। তার ছোটো ছোটো কুতকুতে চোখে। এবং তার কথার উত্তর দিতে থাকে। বরফের মতোই ঠাণ্ডা গলায়।
—     ইয়েস, দিস ইজ ইট।
ছেলেটি তার দু হাতের থাবার মধ্যে একটা মোটা ফোল্ডার ধরে রেখেছে। টেবিলের উপরে। সেই ফোল্ডারটা খোলে। ভালো করে দেখে খানিকক্ষণ; উলটে পালটে। ফোল্ডারটা খোলাই থাকে।
—     ডক্টর মুখার্জী রিপোর্ট পাঠিয়েছেন আমাদের অফিসে। আপনি লাস্ট থার্টি থ্রি ইয়ার মোর অর লেস এই স্বপ্নটি— আই মিন, এই দুঃস্বপ্নটি দেখছেন। ফার্স্ট টাইম দেখেন ইন দ্য ইয়ার এইটি ফোর। তারপর আবার বছর দুয়েক বাদে। নাইনটি এইট থেকে আরও একটু ফ্রিক্যোয়েন্ট। বছরে একবার-দুবার। লাস্ট সেভেন অ্যান্ড হাফ ইয়ার রেকারিং পিরিয়ডটা অ্যালার্মিংলি রাইজ করেছে।
চোখদুটো আরও কুঁচকে ছোটো হয়ে যায় সিংহানিয়ার। একটু নড়ে বসে সে। সবকিছু মনে করার চেষ্টা করে বোধহয়। খানিক পরে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
—     ইয়েস, টু থাউজ্যান্ড নাইন থেকে আই অ্যাম আন্ডার মেডিকেশন। আন্ডার ডক্টর মুখার্জী। তাতে কিছুটা ফল পেয়েছি। সাময়িক। কিন্তু, কিয়োরড হইনি। আসলে, আমার বিজনেস আর এই নাইটমেয়ারটি এক সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে।

Sunday, May 14, 2017

কাশ্মীর হামারে হ্যায় : অদ্বয় চৌধুরী

কাশ্মীর হামারে হ্যায়

কাঠের এই বাড়িটা আমাদের খুব পছন্দ। তার অনেক কারণ আছে। আমাদের দু’জনের পক্ষে বেশ বড় আকারের হওয়ার পাশাপাশি বাড়িটা বহু পুরনো হওয়ায় বাপঠাকুরদাদের স্মৃতি বহন করে। আমাদের ছেলেবেলার সমস্ত স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। বোন আর আমি এই বাড়িটায় একা একাই থাকি। বাবা, মা, কাকা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা আর নেই। ওরা এসে নিয়ে গেছে ওদের। আমাদের নেয়নি ওরা, কারণ আমরা তখন ছোটো ছিলাম। সেই সমস্ত স্মৃতি এই বাড়িটা ঘিরেই রয়েছে। ওদের আসা, বাবা-মা-কাকাদের চলে যাওয়া, আমাদের থেকে যাওয়া— সব।
আমরা বেশ সকাল সকাল উঠে পড়ি ঘুম থেকে। তারপর ন’টার মধ্যে অল্প খেয়ে আমি বাজারে যাই বোনের বোনা শীতের পোষাক পুঁটলি বেঁধে। সারাদিন সেখানে রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে সেগুলো বিক্রি করি। দুটো ম্যানিক্যিনকে— একটা ছেলে আর একটা মেয়ে— বিভিন্ন সোয়েটার বা জ্যাকেট পরিয়ে সাজিয়ে রাখি রাস্তার ধারে। লোকের চোখ পড়ে বেশি। যদিও বিক্রি খুব কমই হয় তারপরেও। আমার মতো হাজার হাজার বিক্রেতা রয়েছে ওখানে। তারপর অন্ধকার ও শীত জাঁকিয়ে পড়লে পোষাকের পুঁটলি আর দুটো ম্যানিক্যিনকে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িটা ঝারপোঁছ করে পরিষ্কার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বোন সারাদিন বাড়ি থাকে, কিন্তু ওর পক্ষেও সম্ভব না।
বোন কখনো কাউকে বিরক্ত করে না। ও ওর মতো থাকে, কাজ করে। সকালের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে ও বাকি দিনটা নিজের শোয়ার ঘরে বা নীচের বসার ঘরে উল বুনে কাটিয়ে দেয়। বোন সেই ছোটোবেলাতেই, যখন মা-ঠাকুরমা ছিল, উল বোনা শিখেছিল। তারপর থেকে ও সব সময় দরকারি জিনিসপত্রই বোনে— শীতের সোয়েটার, মোজা, টুপি, মাফলার, শাল, জ্যাকেট এইসব। ও একটু খামখেয়ালি গোছের মেয়ে। কখনো হয়তো ও একটা জ্যাকেট বুনলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা খুলে ফেলে কারণ সেটার কিছু একটা ওকে খুশি করতে পারেনি। এইসব দেখতে বেশ মজাই লাগে আমার। একগাদা উলের গোছ ওর সেলাইয়ের বাক্সে একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ লড়ে চলেছে স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রবল ইচ্ছায়।

Saturday, April 15, 2017

দ্রিম দ্রিম ৪ | ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম ৪ ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ
আস্তাবলের দিকটা না। ম্যাগনোলিয়া ছিল এদিকটায়। গ্লেনারিজ, কেভেন্টারস ছাড়িয়ে আরও একটু এগিয়ে বাঁ দিকে। জামাকাপড়... ডেনিম জ্যাকেট, জেগিংস-এর দোকান... সেগুলো পেরিয়ে কুংগা যাওয়ার রাস্তাটায়। সাদা সবুজ লাল মেশানো কাঠের বাড়ি। ছবির বইয়ের মতো জানালা। আইভিলতাও ঝোলে বোধ হয়। আমি আইভি দেখিনি যদিও কখনও। নীচে ডানদিকে বাজারে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। হিল কার্ট রোডের দিকে। আমি ঠেলেঠুলে একটা সরু গলির মধ্যে দিয়ে উঠতে থাকি। ম্যাগনোলিয়া একবার দেখে আসা দরকার। সরু গলি। কিন্তু অন্ধকার নয়। ওপর দিকের বাড়িগুলোর টিনের চাল আর কার্নিসের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো আসছে অনেক। দুপাশে লোক দাঁড়িয়ে। কেউ বিরক্ত করছে না। যে যার মতো ব্যস্ত। সিগারেট খাচ্ছে। গল্প করছে। ওয়াই ওয়াই খাচ্ছে। পাশ দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হচ্ছে। ম্যাগনোলিয়ার সামনে এসে পড়লাম।
এটা তো বেশ বড় একটা হামাম! হোটেল ভেবে এদিকে বুক করে ফেলল মৈত্রেয়। ওই তো... জাপানি বাড়ির মতো, চাল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে অল্প। ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-র বাড়িটার মতো। আমি ভেতরে ঢুকি। ঘন বোতল সবুজ অন্ধকার। তার মাঝখান থেকে চাপা রক্তের মতো লাল রঙের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। বাষ্পে আধো-অদেখা হয়ে আছে গোটাটা। কাচের দরজা খুলে ঢুকতে ঢুকতে টের পাই আমার হাইট কমে গেছে।আমি একটা উঁচু-হিল জুতো পরে। আমার গায়ে একটাসাদা শার্ট আর গ্রে রঙের পেন্সিল স্কার্ট

Tuesday, March 14, 2017

একটি শিকারকাহিনি-র শেষ পর্ব : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি-শেষ পর্ব

কল্কিকথা
প্রথম প্রথম সারাদিন একটা ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছে অনিমেষ। আশ্চর্য হয়ে সে অনুভব করেছে, ক্রমশ খিদের ভাব চলে যাচ্ছে তার, চলে যাচ্ছে ঘুম। এমনকি আগুনে তার হাত পুড়ছে না, খোলা তারে হাত দিলে ঝটকা খাচ্ছে না। তার কুঁচকিতে যে প্রচুর চুলকানির দাগড়া দাগড়া ছোপ ছিল, রক্ত গড়াতো আর ইস্কুলে সাদা প্যান্টে সেই দাগ দেখে হেসেছিল আর চাঁটি মেরেছিল ক্লাস ফাইভের কিছু নিষ্পাপ শিশু, সেসব চুলকে আর তার আরাম হয় না। ঘড়ি ধরে একবার দম আটকে রেখেছিল, তিনশো ছাপান্ন ঘন্টা বাহান্ন মিনিট উনতিরিশ সেকেন্ড পর একঘেয়ে লাগায় বিরক্ত হয়ে দম নিতে শুরু করে আবার। এসবের মধ্যে কাজের কথা একটাই, ঘুম না হলেও ঘুম তার পাচ্ছিলই, পেয়েই চলেছিল। যাবতীয় সময় তার কেবল ঘুম পেতে থেকেছে, কিংবা এই গোটাটা, এই যাবতীয় ঘর-ঘুম-আগুন-নিঃশ্বাস সবই এক ঘুমের মধ্যে ভাবতে থাকা যে এবারেরটা অন্তত স্বপ্ন নয়, এইতো যা হচ্ছে সত্যিই হচ্ছে, এরকমই তো হয়...
কেবল এই ঘুম পাওয়ার বিরক্তিতেই বাইরে এসেছিল অনিমেষ। সময়ের হিসেব ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে, তার কেবল মনে পড়ে নিজেকে সে শুয়ে থাকতে দেখেছে, প্রবল ঘুমে চোখ বুজে আসতে দেখেছে, অথচ ঘুমোতে দেখেনি। এখানেই মনে পড়ে, সে যেন কীভাবে নিজেকে দেখে চলেছে, যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে তার মনে হচ্ছে নিজেকে দেখে গাড়ল ও প্রতিভাবান, নিজেকে শুয়োরের বাচ্চা বলে সে গাল দিচ্ছে এবং ভাবছে এই শটটা খানিক অল্প চিপ করে মারতে হতো, কিংবা গাল দেওয়াও আসলে তার ভান, তার আদতে কিছুই যায় আসে না। সুতরাং প্রবল ঘুমের তাড়নায় অনিমেষ মনে করতে পারেনি, সে কীভাবে ভাসতে শিখেছিল বাতাসে, মনে করবার কথাই মনে পড়েনি তার। কেবল বাইরে এসে অনিমেষের মনে হয়েছিল, খানিক সর্ষের তেল পেলে চোখে ডলে দেখতে পারে সে, যদি ঘুম পাওয়া থেমে যায়।
সুতরাং সেসময়ে সারা পৃথিবীর কাজ চলেছিল একেবারেই নিজের নিজের তালে, যা যা চলা থামিয়েছিল সেও কেবল তখন তাদের থামার কথা ছিল বলেই। এককথায়, সবই পূর্বনির্ধারিত বলে অনিমেষ ভেবেছিল, এবং তার ভাবনা দিয়েই এরপর থেকে সব প্যাঁচ খেলা হবে। অনিমেষ ঘুমচোখে চলে গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে, আর বাসে উঠে খেয়াল করেছিল এখানে সর্ষের তেল পাওয়া যায় না এবং এখানে বড় ভিড়। 'ঘুম পাচ্ছে', একঘেয়ে গলায় সে বলেছিল। কেউ তার কথা শোনেনি, বরং পাশের মেয়েটি তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়েছিল, ঢুলন্ত অনিমেষ তার গায়ে ঢলে পড়েছিল বলে। ঠিক সেইমুহূর্তে অনিমেষ প্রথম রাগতে দ্যাখে নিজেকে। এমনিতেই তার মনে হতো এতদিন ধরে, রাস্তায় যে কোনো পাঁচজন মানুষকে চড় মারলে ষষ্ঠজন তোমায় যেচে এসে পাঁচটাকা দিয়ে যাবে, এভাবে কত রাত সে কেবল ব্যথার হাতে বোরোলিন লাগিয়ে কাটিয়েছে, আর সেসব রাগ তার মাথায় চড়ে গেল মেয়েটিকে কড়া চোখে তাকাতে দেখে। অনিমেষ ভীষণ জোরে চকাস শব্দে মেয়েটির ঠোঁটে চুমু খায়, দুহাতে মেয়েটির মাথা চেপে ধরে, এবং আরেকটি চুমু খাওয়ার আগে যখন মেয়েটি মোচড়ামুচড়ি করছে আর বাসের লোকেরা চকিত হয়ে মজা দেখছে, অনিমেষ বলে, এক্ষুণি চাইলে দুচোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতাম, কিংবা ন্যাংটো করলে তো দেখব সেই এক বিচ্ছিরি দলা দলা মাংস, অতএব জামা পরিয়েই যে চুমু খাচ্ছি এতে খুশি হও মেয়ে। এখন, এতসব কথা অনিমেষ মুখে উচ্চারণ করেনি, বাসের মানুষ তাকে প্রচণ্ড হইহট্টগোলে ঢেকে ফেলছিল বলে তার বিরক্ত লাগতে শুরু করে, সে লহমায় দেখতে পায় ইঞ্জিনের উপর মলয় নামের সাদা বেড়ালটি, এবং অনিমেষ উচ্চারণ করে

Saturday, March 4, 2017

মনোলগ : ০৬/০১/২০১৭ - রঙ্গন রায়

মনোলগ : ০৬/০১/২০১৭

"এবং আরো কিছু ভুল করবার জন্য আমাকে আরো কিছুকাল থেকে যেতে হবে!"
-      রতন দাশ

আমি নিজের মত এঁকে নিতে পারবো। ভুল হলে হবে। তবুও তো নিজের মতো। অদ্রিজার আঁকা পোর্ট্রটে আমি শুধু পার্টিকুলার কোন এক জনের মুখের সমস্ত রেখা লক্ষ্য করতে পারবো, কিন্তু নিজের মত নয়। যেভাবে অদ্রিজা দেখাবে ওভাবেই দেখতে বাধ্য। আমি নিজের মত দেখতে চাইছি, হয়তো আমার ইচ্ছা হলো পুজার দীর্ঘ চুল বাঁধার ছবিটাতে চুলগুলো এলোমেলো হোক - ঘাড় ও গলার পাশ দিয়ে নেমে আসুক বা ভেজা চুল পাতলা পিঠে ভারী ভাবে লেপ্টে আছে - চোখের পাতায় তিরতির করছে বৃষ্টির জলনাহ্! এসব আমাকেই আঁকতে হবে। কেউ আমায় সন্তুষ্ট করতে পারলোনা, সম্ভব নয়। ইজেল, ক্যানভাস ভেঙেচুরে এইসব আঁকিবুকি অনিবার্য ভাবে আমারই জন্য

এই সেদিনও আমি 'কালাশনিকভ'এর মানে জানতামনা। যখন জানলাম তখন থেকেই মাথার ভিতর শুধু একটাই ধুন "কালাশনিকভ - কালাশনিকভ"... কি যে এক অদ্ভুত ধূন জানিনা। এরকম হয়। অনেকেরই হয়তো হয়। আমারও আগে হয়েছে। অথচ দ্যাখো AK 47 আমি বাঁটুল দি গ্রেট থেকেই শুনে আসছি। কালাশনিকভ কে আমি আমার মত করে কিছু একটা ভেবে নিয়েছিলাম। সেটাও এখন মনে পড়ছেনা।

Tuesday, February 28, 2017

“Everything I told you before is a lie” - একটি দেবীপক্ষের Travelogue : রাজর্ষি মজুমদার

“Everything I told you before is a lie” - একটি দেবীপক্ষের Travelogue


যে মেয়েটি কাফকা অন দ্য শোর পড়ছিল সে ধানবাদে নেমে গেছে আমাদের কামরার প্রত্যেকের ব্যক্তিগত চাউনিগুলো আমি ঢুকিয়ে রাখছি একটা বাক্সে চিন্তা হচ্ছে জামাকাপড়ের জন্যআশ্বিন শেষের ভরা একটা রোদ এখন রেলের জানালায়। এই আলো, এই জানালা, নীল রঙ মাখানো হাত সব রেলের। একটা একটা করে দৃশ্যকল্প, একটা একটা করে কথা সরে যাচ্ছে , সরে যাচ্ছে আমার Dissertation শুখা মাঠ, ছিরিছাঁদহীন বাড়ি ঘর দোর পেরোতে পেরোতে প্রশ্ন জাগছেএরা কি সমকামকে স্বীকৃতি দেবে?

একটু পরে সূর্যাস্ত দেখব – কোডারমার ধাপে ধাপে নেমে আসা জঙ্গল, ধূসর পাথুরে খাদের ওপর জেগে থাকা বৌদ্ধ বিহারের ছবি তুলে রাখতেই হবে আমায়। এসব ছবি কাজে লাগবে লেখার সময়, দিন এগারো পরে এ বিকেল পড়ে আসার ঘটনা নিয়ে লিখতে বসে।
মাঝে মাঝে স্বপ্ন আর সিনেমা ছাড়া লেখাতেও আমরা সময়কে সম্প্রসারিত করতে পারি বোধ হয়? এই পারাটা আসলে পাঠকনির্ভর। স্বপ্ন আমরাই তৈরী করি , আমরা সিনেমাও তৈরী করতে পারি। কিন্তু পাঠক ছাড়া বোধহয় লেখা তৈরী হয়না।  
এই যেমন এ লেখা লিখতে লিখে আমার কাছে সময় অনেকগুলি অস্তিত্ব হয়ে ঘোরাফেরা করছে। হয়ত পাঠক বেছে নেবেন তার মধ্যে একটা – লেখাটার একটা নতুন সময় তৈরী করবেন তিনি। এসব ভাবতে লিখতে একটা ফ্লেক ধরাচ্ছি আমি, ধোঁওয়াটুকু ছাড়ছি দশদিন আগের সময়ে  – যেখানে আমি আদিত্য আর শ্রীরাগ টিনের টেবিলটার ওপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট টানছি চেয়ারগুলো পেছনের দিকে ঝুঁকে গেছে, বাইরে একটা পাতাও নড়ছেনা এমন গরম। আদিত্য ওর Dissertation এর কাজটা নিয়ে বলছিল – cinema তে  time and space এর ব্যবহার স্বভাবতই আমার কথায় তারকোভস্কি চলে এলেন ... তার ওই হালকা নীল টোনের আকাশে মিশে যাওয়া জনারের ক্ষেত , বেড়ার ওপর সিগারেট ফুঁকতে থাকা মারিয়াকে নিয়েজঙ্গলের সেই গাছগুলোর জ্যামিতি বা বরফের ওপর ডাঁই করে রাখা কাঠের ভিস্যুয়াল থেকে একটা পাপিয়ার ডাক ছুটে চলে এল নদীতীরে। সেখানে নগ্ন প্যাগান মেয়েটি চোখ দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে – “ What sin? Tonight is for lovemaking; is love a sin? ”  
তাকে নিয়ে আমার আজ নদীতে যাবার কথা  

সিগারেটটা ঘুরছিল টেবিলের চারদিকে – হাতে হাতে। ঠিক এইসময়ই আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শ্রীরাগ বলে ওঠে – “ He was a magician. By his works he just said all the Soviet montage movement filmmakers that – “You guys just … just fuck of! Film is not all about theories, technicality, cutting. It’s about playing with time and space.”

Thursday, February 16, 2017

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

তো এক দেশের মানুষ ভাত খেতে ভালবাসত আকাল পড়ার আগে। আকাল পড়ায় অগত্যা বাধ্য হয়ে মকাই। প্রথম প্রথম গলা দিয়ে নামতে না চাইলেও আস্তে আস্তে সয়ে গেল। তারপর এল সেই মোক্ষম দিন। খেতে বসা সন্তানের করুণ মুখের দিকে চেয়ে থাকা এক জর্জরে মা আনমনে বলে উঠল~ বালের ভাত, মকাই ঢের ভাল... আর কি, একজন একজন করে এবার সবাই গুণ গাইতে শুরু করল মকাই এর। ধীরে ধীরে দেশের মানুষ ভুলেই গেল ভাতের স্বাদ। শুধু একজন পারল না কিছুতেই। ডাইনী সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মারার আগে অব্দি পাতে মকাই নিয়ে বসে সে শুধু ভাতের কথা ভাবত।
















ঋপন ফিও
Reepan Fio

Tuesday, February 14, 2017

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার : সুমন মজুমদার

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার

তীর্থ ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল। সকালে বেরিয়েছে দুই-তিনটে জায়গা ঘুরে, বেশ অনেকগুলো তামাক খেয়ে বেশ হাবুডুবু হয়েই ট্রেনে উঠেছিল শিয়ালদা থেকে। দশটা তিরিশের বনগাঁ লোকাল, এই নামে একটা সিনেমাও হয়ে গেছে বোধহয়। এসময় ভীড় থাকার কথা নয়, বসার সিট অন্তত পাওয়া যায়, যুদ্ধ না করেই। তীর্থ সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, তবে আজকাল বিশেষত ডিসকভারি এবং ট্রেভেল চ্যানেল-ই সে দেখে। কি সুন্দর দেখায় চায়না অথবা ইস্টার্ন এশিয়া। সবুজ ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে সুন্দর হাসিমুখের মানুষ তাদের রঙ বেরং এর খাবার, জামাকাপড়। তীর্থ ঠিক করে রেখেছে যে সে এশিয়ার এই দেশগুলোয় একবার অন্তত যাবেই। আজকাল এমনকিছু কঠিন খরচপাতি-ও পড়েনা। দুবার কাসৌল যাবার পয়সা জমাতে পারলেই যাওয়া যায়।

তীর্থর তামাক খেয়ে নেশা হয়ে গেলে চশমাটা ভারি লাগতে থাকে, এসময় তার সন্দেহ হয় চোখের পাওয়ার কমে গেছে কিনা, অথবা তীর্থ মনে মনে ঠিক করে আগামী চশমাটা ফাইবার-এর বানাবে। কাঁচের ওজন ভারি। তীর্থর মনে হয় যেন চশমা পরে থাকার ফলে সে আশেপাশে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেনা, এ সময় মাথা ভারি লাগে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। তীর্থ নিজেকে সামলে ফেলে এই সময়গুলোতে। চশমা খুলে ফেলে, গভীর শ্বাস নেয়। বেশি বাড়াবাড়ি হলে চোখে জল ছেটায়। অনেকদিন আগে ডাক্তার লো-প্রেশারের কথা বলেছিল, সেটাও একবার মনে পড়ে যায়।

Monday, February 6, 2017

একটি শিকারকাহিনি : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি

মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যখন বসে থাকতে প্রথম দ্যাখে অনিমেষতখন সে ছিল একটা অটোতে।

এখানে এসে প্রথমবারের মতো গল্পটা একটা লাল ঘরে ঢুকে যায়। লাল ঘরের আলো ছিল নরম লালআসলে লাল ঘরটা ছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির ভিতর গভীরে কোন এক বিন্দুতে আলম্বিত। সেই লাল ঘরের মেঝেও হওয়া উচিৎ লালকিন্তু অনিমেষ লাল মেঝের ঘর শেষ দেখেছিল তার মামাবাড়িতেদোতলার পুব দিকের ঘরটায়। সেই লাল ঘরেই মামা মামির ফুলশয্যে হয়অনিমেষ তখন বছর বারোর। মামির ছেলে মেয়ে হয়নিমামি ছিল ভীষণ মোটামামি দুপুরবেলা একা একা ভুল বকতে বকতে কখনো পড়ে যেত সেই লাল ঘরের মেঝে ফুঁড়েগোলাপের দুই পাঁপড়ির মাঝের ঘরটায় এসে পড়তোতার পর আরো আরো গভীরেঠান্ডা বেরঙ অন্ধকারে ভেসে পড়তোযেন নীচ থেকে লক্ষ লক্ষ হাত মামিকে ম্যাজিক করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখছেম্যাজিশিয়ানদের হাত অল্প অল্প নড়ছেভীষণ লাল একটা কিছু ঢেউয়ের মতো লকলক করছে চারদিকে ঘিরে। মামা রাতে অফিস থেকে ফিরে মামিকে খুঁজে পেত নাচিলছাদে গিয়ে খিদে পেটে ঘুমিয়ে পড়তো। মামির পোষা দুটো বেড়াল ছিলযাদের একটা ছিল সাদার মধ্যে বাদামী ছোপছোপ। সেটা ছিল খুব রোগামানুষ হলে নিমাই বলে আওয়াজ খেতো এমন রোগাসেটা একগাদা বাচ্চা দিয়েছিল একবার। সেসব বেড়ালদের মধ্যে কারো নাম মলয় ছিল না বলেই অনিমেষের ধারণা।

Wednesday, November 30, 2016

হরকরাকে লেখা চিঠি : সর্বজিৎ ঘোষ

হরকরাকে লেখা চিঠি

রাস্তা পেরোতে গিয়ে শ্যামলালের হঠাৎ মনে হল, তাকে নিয়ে কেউ কোনোদিন কবিতা লিখবে না। অথচ ছোট্টো সবুজ বিন্দুজীব যে মানুষটি দপদপ করে বলতে থাকে আর কতক্ষণ, সে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলো লালে। শ্যামলালের মনে হল সে তাকে বলছে, ওহে শ্যামলাল, এই যে কুড়ি লক্ষ ত্রিশ হাজার পাঁচশো সাতাশিতম বার তুমি সফলভাবে রাস্তা পেরোলে, এবং প্রত্যেক মৌলিক সংখ্যকবারে পেরোতে গিয়ে যে তুমি গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যাও, (আহা সে বাঁচা তুমি জানবে না; অঙ্কে কাঁচা)... শ্যামলাল শুনতে পেলোনা বাকিটা। হয়তো সে বলতো শ্যামলাল জানে না রাস্তা পেরিয়ে আসলে সে কোথায় যাচ্ছে, বা রাস্তা সে আদৌ পেরোতে পেরেছে কিনা, যেভাবে শ্যামলাল জানে না এখন সে কোথা থেকে ফিরছে। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে বেরচ্ছে তার ইউনিভার্সিটি থেকে, শেষ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে খুঁজতে গিয়েছিল এক জলে ভেজা দাঁড়কাক, যে আসলে ভেজার ভান করে পালক ঝাড়ছিল। কিন্তু, এও তো সমানভাবে সত্যি, শ্যামলাল যে রাস্তা পেরোচ্ছিল তার এপারে ছিল প্রাচীন লাল এক সরকারি অফিস, যার লিফটের দড়ি দিয়ে খুব ভালো ফাঁসি হয়, শ্যামলাল ভেবেছিল। যেমন শ্যামলাল এও জেনেছিল, নীলদর্পণ নাটকে এক কুখ্যাত চাবুকের নাম শ্যামলাল এবং তার নিজের কোমরে ছিল প্রাগৈতিহাসিক এক দাদ, যে দাদ তার মনের সব কথা বুঝতো বিনা ভাষায়।

রাস্তায় অন্ধকার হয়ে আসছিল, ভেজা ছিল রাস্তা, অথবা তীব্র দুপুরের মরীচিকায় রাস্তা হয়ে উঠেছিল সবুজ কোনো শস্যক্ষেত। শ্যামলাল বিড়ি ধরিয়েছিল একটি, এবং তার মনে পড়েছিল কবিতার কথা। শ্যামলাল তো জানতো, মহাপ্রলয়ের সময়ে নৌকায় যে পাঁচটি কবিতা নিয়ে উঠতে পারবে শ্যামলী, তার মধ্যে শেষতম কবিতাটি স্বয়ং শ্যামলালের। যদিও সেই কবিতাটি শ্যামলাল এখনো লিখে উঠতে পারেনি, কারণ শ্যামলীকে এখনো সে চেনে না, চিনলেই জিজ্ঞেস করে নেবে সে কেমন কবিতা শ্যামলীর পছন্দ, কিংবা কবিতার বদলে শ্যামলী চায় কিনা একফালি ছায়া ও রোদ্দুরঘাস জমি। অথচ, শ্যামলাল ভাবে, কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না কোনোদিন। আজকের এই ট্রাফিক সিগনালে শ্যামলালের তো দাঁড়ানোর কথা ছিল না; যেভাবে হিজড়েরা শাড়ি তুলে অন্ধকার দেখানোর ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, শ্যামলাল যেন দাঁড়াচ্ছে গিয়ে প্রতিটি সিগনালে, এভাবেই চেয়ে যাচ্ছে একটা আস্ত কবিতা। শ্যামলালের মনে হয়েছিল আজ পর্যন্ত সে যা যা লিখেছে সব একেকটি গর্ভস্রাব, কারণ শ্যামলাল জানত মহাপ্রলয়ের সময় কোনো নৌকা পাওয়া যাবে না শেষ পর্যন্ত। শ্যামলীকে সে একবারই দেখেছিল, বর্ধমান থেকে ফেরার পথে কর্ড লাইনে, ট্রেনের দরজায় বারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে, একহাতে হাতল ধরা, চুলগুলো খোলা ছিল এবং হাওয়ায় একে একে উড়ে যাচ্ছিলো, শ্যামলী ক্রমশ ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছিল আর রোদ্দুর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অথচ, আজ এখনো শ্যামলালের বাস এলো না, কবিতার মতো সে যদি স্থির বুঝতে পারতো বাস আর আসবে না, বাস কোনো ছন্দকাটা তালকাটা শব্দ, এবং অপেক্ষা বিষয়টা আসলে মাথাব্যথার মতো আদুরে... শ্যামলাল মন দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে সাঁটানো 'গোপনে মদ ছাড়ান' বিজ্ঞাপন পড়ছিল এবং ভাবছিল, সে কি কোনোদিন মাতাল হয়নি, সে কি চায়নি ঝাল ঝাল লংকাকুচি মাখা ছোলাসেদ্ধ এবং খোঁয়ারি-ভাঙানো লেবুর জল, তাহলে কেন তাকে নিয়ে একটা, অন্তত একটা বিজ্ঞাপনও লেখা হল না এতদিনে!


Saturday, November 26, 2016

নিষেধাজ্ঞা : অদ্বয় চৌধুরী

নিষেধাজ্ঞা

“আজ রাত দশটা থেকে রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত নিষিদ্ধ।”
       সেদিন সন্ধে থেকে গোটা এলাকা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছিল, টিভি-রেডিও সর্বত্র ঘোষণা হচ্ছিল লাগাতার। সকলেই জেনে যায় এই নিষেধাজ্ঞা। যারা অনেক রাত করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে তারা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল।

       যারা রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেনা, যাদের গাড়ি আছে, তারা বেজায় খুশি হয়েছিল এই নিষেধাজ্ঞায়। রাস্তায় ভিড় কমবে, ট্রাফিক জ্যাম কমবে। গাড়ির দোকানদাররাও খুশি হয়েছিল। এবার গাড়ির বিক্রি বাড়বে। উপরমহলের তরফে বলা হয় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করলেও যাদের বাড়িতে গাড়ি লুকিয়ে রাখা আছে, বা অন্যত্র তাদের গাড়ি বেনামে খাটছে, সেইসব লোকের লুকানো গাড়ি ধরার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা গাড়িওয়ালা এবং গাড়ির দোকানদাররা জানত। এই সিদ্ধান্ত মূলত এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই— সকলেই যাতে ‘গাড়িওয়ালা’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। যাদের গাড়ি নেই, অথবা গাড়ি কেনার কোনোভাবেই সামর্থ্য নেই, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাবে, অথবা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

       পরের দিন রাস্তা একেবারে শুনশান। হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করছে। ফুটপাথে কোনো লোক নেই। দু-একটা বড় দোকান আর সমস্ত গাড়ির দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান খোলেনি। কোনো নতুন গাড়িও কিন্তু রাস্তায় দেখা যায় না। না লুকিয়ে রাখা গাড়ি, না নতুন কেনা গাড়ি। আগে যেগুলো চলত সেগুলোই শুধু দেখা যায়।

Tuesday, November 15, 2016

এখন আমার খুব কান্না পাচ্ছে : তৃষা চক্রবর্তী

এখন আমার খুব কান্না পাচ্ছে

এখন আমার খুব কান্না পাচ্ছে। অথচ কান্না ঠিক কেমন হয় আমি মনে করতে পারছি না, ঠিক কীই বা মনে করতে চাইছি, কান্নার স্বাদ, কেমন দেখতে হয়, অথবা এমন কোনো বিশেষ গন্ধ যা দিয়ে পৃথক হওয়া যায়। মাঝে মাঝে তো এমনই মনে হয়, কেবল পৃথক হবার জন্যই আমরা গন্ধ ব্যবহার করি। নিশ্চয় তোমার মনে আছে ময়দানে একটা বিকেল অন্তত আমরা একসাথে কাটিয়েছিলাম - খুবই সাহিত্যপন্থী হয়ে পড়ছি আমরা আজকাল, নয়ত হঠাৎ সকাল আর বিকেলের আলোকে আমাদের এক মনে হবে কেন, আর সেই আলো পৃথক করতে কেনই বা খোঁজা হবে ক্লান্তির পার্থক্যরেখা। তোমার কি মনে আছে, পৃথকত্ব আমায় খুবই আনন্দ দিয়েছিলো? পৃথকত্ব, পৃথকত্বই কি, অথবা পৃথকত্বের আবিষ্কার। যেকোনো বিকেলই এভাবে আমায় তোমার কাছে পৌঁছে দিতে পারে না। অথচ, আজ পৌঁছেছি। এমনই সে যাতায়াত, তুমি বিমূঢ় জিগেস করছ কেন এসেছি। এখুনি যদি বলি, তোমার ঘরের জানলাটা দিয়ে আজ অদ্ভুত বিকেল দেখা যাচ্ছিলো।  তোমার কাছে অনেক ভিড় ছিলো।  আমি তাই বিকেল দেখতে গেছিলাম। মনে পড়ল ময়দানে একটি মেয়ের কাছে খুব সুগন্ধ পেয়েছিলে, আমি কি খুব রেগে গেছিলাম অথবা নীরব মন্তব্য করেছিলাম ফাঁকা ময়দানে এরা গন্ধ মেখে ঘোরে কেন, গন্ধ ভিড়ের, একার নয়। পৃথক হতে হতেও পৃথক হবার টাল সামলাতে না পেরে মেয়েটি কি আলতো ঢলে পড়েছিল তোমার গায়ে? আর তুমি তাকিয়ে ছিলে খুব মোলায়েম?

Friday, November 4, 2016

না পৃথিবীর দূরত্ব : দেবাদৃতা বসু

না পৃথিবীর দূরত্ব

একটা ড্রিমের ভেতরবসে আছি লুকিয়েএরপর সকাল হবে। সময়কনার চলাচলকে কেন্দ্র ক’রে ক্যাপ্টেন হুকের জাহাজ সামান্য দুলতেই শোনা যাচ্ছে ব্যাপারীদের বিভিন্ন আওয়াজের দুর্যোগ কাঠের পাটাতনটা ফুরোলেই বাজার একটাকাঠের দরজার তলায় যতটুকু ফাঁক, তার আন্দাজে শরীরটা বড়ওই ফাঁকটুকুই আপাতত সম্বল - গন্তব্য, পরিত্রাণ এবং কোলাহলমুখরকোথাও একটা নিষিদ্ধ ঘড়ি টিক টিক করছে আর আমি ভাবছি কি ক’রে লুকিয়ে থাকা যায় আরও কিছুক্ষণ। কেউ যেন দেখতে না পায় আমাকে। অথচ এরকমভাবে ভোর হতো এক একটা স্বপ্নের খোঁজে। মূলত শীতকাল - লেপের তলাটা সুবিধা মত সাজিয়ে নিতাম। এমনভাবে একটা সিমুলেশান, যেন বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগসূত্রগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে আসা বাসন ও জলের বিনিময়ে যে আওয়াজ - মনে হতো পাইরেটদের হর্ন আর হর্নবিলের ডানার ঝটপটঅনেকটা এপার জুড়ে এই ল্যান্ডমাসপ্যানের সাম্রাজ্যে কেউ বড় হয় না কখনো, একমাত্র টিঙ্কার বেল ছাড়াএত রঙ আর এত গন্ধ, পথ হারানোর ম্যাজিকটাই কবিতা হয়ে ওঠেওই যে বেসামাল একটা বৃহৎ ডিনার টেবিল, ভরে উঠছে কাল্পনিক খাবারে আর তার পাশেই একটা পৃথিবী, যার সমস্ত হ্রদ এবার আয়না হবে। পৃথিবীর প্রথম আয়নগুলোর জন্ম এখানেঘড়ির কাঁটাগুলো ঘুরতেই থাকে, টান পড়ে ঋতুচক্রে, শুধু বয়স বাড়ে না। অন্ধকার হলে টিঙ্কার বেল ডাকে, “lost boys, lost boys, dinner is served”
প্রকাণ্ড ওই সিমুলেশানের ভেতর থাকতে অভ্যস্ত হয়ে তখন মনে হত এক দস্তানার কথা। ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে তার গহ্বর এবং বাড়ছে সংসারের সদস্য। আমি ভাবতাম যদি ওদের মত ওদের সাথে থাকা যায়। আর আমার শীতের লেপ, কম্বল, বালিশ মিশে যেত ওই প্ররোচনায়বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পরলেই টর্চ জ্বেলে দেখতাম কেউ কোথাও আছে কিনা। বরং টর্চটা নিভিয়ে দিলেই দেখা যেত ওদের বেড়ে ওঠা, সংসার, ওদের ড্রামা - কমেডি, ট্র্যাজেডিব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের মত সহজ ও অদৃশ্য। তখন ভাবতাম সকাল হবে। অহেতুক আর যেতে হবে না স্কুলে। ঘুম চোখে লেপটা সরালেই দেখা যাবে ওই বাগান, অতিকায় জলাশয় আর ছোট ছোট র‍্যাবিট হোল। একটা এমন জায়গার কথা লেখা হবে যেখানে প্রতিদিন শহর এসে মিশে যেতে থাকে সমুদ্রের ধারে লুকিয়ে রাখা ঝর্ণার জলে। মানুষ তো এভাবেই অমরত্বের কথা শিখেছে, তার ধান, গম, আস্তাবল, হাতি, ঘোড়া, ফসল ফেলে রেখে বারবার ফিরে গেছে অরন্যে ।
জরায়ুর ভেতর নড়াচড়া করছে শব্দরা। বিটস এবং পিসেস সমেত পৃথিবীর সমস্ত শব্দ,  কোল মাইন, পরিত্যক্ত জাহাজ ঘাট, নোনা হাওয়ার গন্ধ, ঈষৎ আর্দ্র অনর্গল বেড়িয়ে পড়ছে ফ্যালোপিয়ান টিউব বেয়ে। এদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকাগুলো নিয়ে সভ্যতা হবে। শুধু নির্মাণ নয়, সারি দিয়ে অগুনতি পিরামিড হয়ে উঠবে এলিয়েন স্পেসশিপের ল্যান্ডিং প্যাড। কখন সময়কে ফাঁকি দিয়ে লেখা হবে ইতিহাস। এইভাবেই সময়কে ফাঁকি দেওয়ার নিয়মে ফিরে যাওয়াগুলো থেকে যায়। রিডিং ল্যাম্প থেকে মাথা তুললেই দেখা যেত অসংখ্য ভাষার কাটাকুটি খেলা। জানলার বাইরে আরও একটা রেইনি ডে বদলে দিচ্ছে লিখে রাখা ইতিহাস আর ইতিমধ্যে সমস্ত ঘড়ি কখন যেন সব আমার হয়ে গেছে।

Sunday, October 9, 2016

ছিন্নমূলঃ গুলশনারা খাতুন

ছিন্নমূল

বিড়ির আগুন পড়ে পড়ে টি-শার্টময় ইতিউতি ফুটো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, ইঁদুরে, আরশোলায় কেটেছে। অবশ্য এসব নিয়ে রিজুর ন্যাকামিও ছিল না কোনওদিন, আর মনখারাপ তো নয়ই। এমনিতে আঁতেল-ছাপ জামাপত্তর। হলদে টি-শার্টে কয়েক লাইন সুমন চেয়ে আছে। অথবা গেলবার পৃথ্বীর এনে দেওয়া বাংলাদেশের জামাটাও আদর করেই গায়ে চড়ায়। বুকে-পেটে বিড়ির ফুটো নিয়ে রিজুকে ভিখিরি-কাটিং না দেখালেও, ব্যর্থ কবির জম্পেশ লুক দেয়। রিজু যদিও কবিতা লেখেনি কখনও। উঁহু, একবার, ক্লাস সেভেন, যা নাকি হেভেন, তখন লিখেছিল। হিন্দি ক্লাসের সাবরি মিসকে দেখে। ‘সাবরি মিসের বিশাল বুক/ তাকিয়ে থাকতে বিশাল সুখ/ বুকের মাঝে খাঁজ/ হরেক রকম সাজ’। প্রিন্সিপ্যাল আর বাবার  যৌথ ক্যাল-সহ ক্লাসের হারামি পাবলিকের অকথ্য প্যাঁক মিলিয়ে, হেভেন সেভেন হেল হয়ে গেছিল। তারপর তো টিসি। ইংরাজি মিডিয়ম থেকে সোজা তীর্থপতি। তারপর আর ৩০ বছর কবিতা লেখেনি রিজু। রাদার, কিছুই করেনি। ছবিও আঁকেনি, তবলা শেখেনি, গীটার বাজায়নি, কলেজে লিটল ম্যাগ করেনি। অ্যাস্ট্রো ফিজিক্স পড়ার চোরা বাসনা লুকিয়ে রাখতে রাখতে ছোড়দাদুর চিলছাদের ঘরে মাঝেমধ্যে নানা যন্ত্রপাতি বানিয়ে তারা-টারা দেখত। সে রিজুর গুপ্তরোগ। লোকাল ট্রেনে ডিকে লোধের অ্যাড দেখে নিজের মত নাম নিয়ে নিয়েছে। গুপ্তরোগের চিকিৎসা নেই। কাজকম্ম কিছু জুটলে-মুটলে ওই রাত-বিরতে জয়েণ্টে শেষ টান দিয়ে হয়তো আকাশের গায়ে কান পাতা। রিজু নিজেকে আজকাল মেঘ-টেঘ ভাবে। ফুটো হয়ে বৃষ্টি পড়ে। ফুটো জামা চুইয়ে যেমন ঘাম।

Wednesday, September 21, 2016

খেজুরে লেখা : রঙ্গন রায়

খেজুরে লেখা

"খেতে পারি কিন্তু কেন খাবো" এই স্লোগান তুলে কেউ কেউ যদি আমরন অনশনে বসে পড়ে তবে সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলবার নেই। পানু শেষ হয়ে গেলে যেমন চটি গল্পে কাজ চালিয়ে দিতে পারি সেই দৃষ্টি তে তোমার দিকে তাকাতে পারিনা বলেই তুমি আমার মন খারাপ করে দিতে জানো। আমি আন্দোলন টান্দোলন করিনা কোনদিন। সেরম ভাবনা বারবার বিপ্লবের কথা মনে পড়ায়। এই যেমন এই লেখাটাই ধরা যাক, মানে কথা "লিখবো লিখবো করছি কিন্তু লিখতে পারছিনা" গোছের এক জগাখিচুড়ির জন্ম দিচ্ছে। তো খেঁজুরে আলাপ ব্যাতিরেকে এবার যদি 'ফেবুর' দেওয়ালে একটা গরম গরম স্ট্যাটাস জুড়ি তো বেশ হয়। রস বোধ কে দুরে ঠেলে কট্টর ভাবে যদি লিখে দিই, "অনেক হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, এবার একটু হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া যাক।" তবে প্রথমেই তথাকথিত হিন্দুরা চরম খিস্তি খেউর শুনিয়ে আমাকে আনফ্রেন্ড করবেন। মুসলিম দের তুলনায় লক্ষণীয় ভাবে হিন্দুরা আমাকে দুষবে শিবসেনার খোঁচড় বা আর.এস.এস এর চ্যালা বলে। আহাহা "আমি কোন পথে যে চলি কোন কথা যে বলি" -  কিছুই বলবার নেই বলেই এতকথা শুনিয়ে দিচ্ছি, তাহলে ভাবুন তো বলবার থাকলে কি কেলেঙ্কারিই না বেঁধে যেতো!!!
আবার এই কথাটাও আমি ভেবে পাইনি যে কেউ কেউ বলছেন "অর্থই অনর্থের মূল" আবার কেউবা "একমাত্র অর্থেরই অর্থ রয়েছে বাকি সব অর্থ হীন" নাকি রামকৃষ্ণ দেবের বাঙ্গাল সংস্করণ টাই মেনে নেবো "ট্যাহা মাটি মাটি ট্যাহা।" 'নাহ! সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ'!

Sunday, September 18, 2016

গুলশনারা খাতুন : ব্যবহারিক চিত্রনাট্য

ব্যবহারিক চিত্রনাট্য

টিস্যু পেপারের বাণ্ডিলটা মা লুকিয়ে রাখবেই। সূর্য বহুবার চুরি করে পড়ার টেবলের ড্রয়ারে রাখে। মা ঠিক ফাঁক বুঝে বের করে নেবে। ধুত্তেরি। আবার সেই খবরের কাগজ দিয়ে মোছো। কী  যে খড়খড় করে। নাহ। পাওয়া গেছে। বাবার কেস ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে অন্তত চাদরটা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক। উম্মম, অ্যাই অ্যাই হয়ে গেছে। সূর্য মাঝেমধ্যে ভাবে ইজাকুলেশনের পর স্পার্ম জমিয়ে বোতলে পুরে রাখবে। তারপর শক্ত হয়ে গেলে চিনি ছড়িয়ে বাবাকে খেতে দেবে। নে বাল। তোর পয়সাই খাই, তোর মুখেই মুতি। না মানে, ওই আর কি। এখন শালা লালবাজারের কেস ডায়েরি লেখার পাতায় ল্যাটপ্যাট করছে মাল। রুম্পিদি থাকলে ওটাই চেটে চেটে খেত। বাবার কথা ভেবে হেব্বি হাসি পায় সূর্যর। বুড়ো ভাম, ঠিক করে দাঁড়ায় না। ধরে এনেছে ডবকা মাগি। সূর্যরই লাভ। দিনে রুম্পি, আর রাতে মা। হিহি। বেচারা সূর্যর বাবা।

সূর্যদের বাড়িটা একদম ঈশাণ কোন ঘেঁষে বানানো। দাদাই নাকি কোন এক ফ্রেঞ্চ আর্কিটেক্টকে দিয়ে বানিয়েছিল সাধ করে। বুড়ো শেষ বয়সে বীর্য মাথায় উঠে মরে গেছিল। মরার আগে অবধি রান্নার কাজের লোকের সঙ্গে ফস্টিনস্টি। বুড়োর হাত-পা বাতে অকেজো ছিল নাকি। মালতীদি দিনে রান্নাঘরে খুন্তি নাড়ত আর রাতে বুড়োকে নেড়েচেড়ে দিত। জানলার কার্নিশে বসে সূর্য ভাবে, কী চোদনখোর ফ্যামিলি শালা আমার। হ্যাঁ? সব সব কটা শালা এক সে বড় কর এক হারামি। সূর্য মাঝেমধ্যে ভাবে, বড় হয়ে  যখন নভেলটা ফাইনালি লিখে ফেলবে, তখন কোনটা রাখবে, আর কোনটা বাদ দেবে। সব ভুলভাল। যেমন সূর্য নিজেই কি বিশাল একটা ভুলভাল। জন্ম থেকে বড় হওয়া, সব ভুলচুক। আরও একটু ছোটবেলায় সূর্য যখন কথা বলতে শেখেনি, তখন থেকে শিখে গেছিল সে ভুলভাল। নানা, সূর্যর ছোটবেলা মানে খুব বেশি ছোটবেলা নয়। পাশের বাড়ির জিকো, তাতাই, পিকুরা যখন খই ফোটাচ্ছে, তখনও সূর্য ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকত। বু-বু করে কিসব যেন বলে ফেলার চেষ্টা করেই বুঝত, নাহ হচ্ছে না। বাবা রাতে বাড়ি ফিরে মা-কে খিস্তাতো।

Monday, August 29, 2016

মৈনাক পাল'এর - প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে

প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে

        নিসর্গে রাখা আছে জমদগ্নির হাড়। মানে, নিসর্গ বলতে যদি ওই জাহ্ণব্যোবলকোনা প্রাবৃটপ্রেয়স ছাদটিকেই বোঝায়। এহেন হ্যালোজেনময় আরবান ছাদে বসে বৈনতেয়র মাথায় এই পংক্তিটিই কেটে বসলো।
       আচ্ছা, মা যে বলে ছাদের সুরকির নীচে সত্যিই জমদগ্নির হাড় আছে। হতেও পারে। নাহলে অতটা উঠোন জুড়ে অ্যাপার্টমেন্টের তেরশো স্কোয়ার ফুট কেউ ছেড়ে দেয়, স্রেফ একশো কম দিয়েছে বলে; হেসেছিল অর্জুন মেরহোত্রা, সে জানতো এরা লড়বে না। বৈনতেয়র তখন ক্লাস ইলেভেন। বাবা লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে গেল। না, সে তখনো জমদগ্নির হাড় খুঁজে পায় নি।
       আলসের পাড়ে ডেকচেয়ারে বসে বেমালুম হেসে উঠলো বিনু। গ্র্যাজুয়েশনের পরপরেই বোধের সাথে সাথে তার আর একটা অনূভুতি জন্মেছে – সারভ্যাইকাল স্পন্ডাইলোসিস। সেটাকে মাঝে মাঝে ডানা ওঠার ব্যথা বলে মনে হয় তার। আক্কেল দাঁত উঠলে চোয়ালে ব্যথা করে না - সেরকম।
       কিন্তু ব্যথা সেরে যাবার আগে জমদগ্নির হাড় খুঁজে পাওয়া চাই। মা বলে না। খালি বলে - মাঝছাদের বেদীতে উঠবি না গোরু, তোর তো ঘুড়ি ওড়ানোর সময় পা মনে থাকে না। বলার সময় মায়ের মুখটা কেমন বেগুনী হয়ে যায়। রান্নাশেষে মুখে দিয়ে হলুদ বেশি লাগলে যতটা বেগুনী হয়, তার চেয়েও বেগুনী। বৈনতেয় তখন ঠিক মা কে বুঝতে পারে না। মা যেন তার কাছ থেকে গুটিয়ে কুঁকড়ে ছাদের অন্যপারে চলে যায়। ওই সময়টা বিনুর বড় ইচ্ছে হয় মাকে জড়িয়ে ধরতে, গলায় যেন সেই হাড়টা আটকে যায়।